×
অফবিট

৫০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে শুরু করেছিলেন ব্যবসা, আজ দুই চাকার জগতে ধ্রুবতারা ‘হিরো’

হিরো ম্যাজেস্টিক এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে 'হিরো মোটরস'

Advertisement

আজকের যুগে বাচ্চাদের হাতে স্মার্ট ফোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের গ্যাজেট শোভা পাচ্ছে। কম্পিউটারে ভিডিও গেম থেকে শুরু করে বড় হতে না হতেই বাইক, দুনিয়া আজকে অনেকটাই পরিবর্তিত। তবে একটা সময় এমন ছিল যখন স্মার্টফোনে গেম না, বরং বন্ধুদের সাথে সাধারণ খেলা ছিল একটা গোটা জেনারেশনের সময় কাটানোর একমাত্র উপকরণ। সেই সময় স্মার্ট ফোন ছিল বিলাসিতা। বাইক কেনার সামর্থ ছিলনা অনেকের কাছে। সেই সময় সারা দুনিয়া জুড়ে সাইকেলের রমরমা। ভালো নম্বর নিয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলে বাড়ি থেকে গিফট করা হতো নতুন সাইকেল। আর সাইকেলের কথা যখন হচ্ছেই, তখন হিরো কোম্পানির নাম উঠবে না এরকমটা অসম্ভব।

Advertisement

ভারতের অন্যতম এই সাইকেল নির্মাতা কোম্পানি তৈরি হওয়ার পিছনে রয়েছে একটি বিশাল বড় ইতিহাস, যার সঙ্গে আজ আপনাদের পরিচয় করাব আমরা। দুই চাকার এই সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন ব্রিজমোহনলাল মুঞ্জাল এবং তার সাথে ছিলেন তার অন্য তিন ভাই দয়ানন্দ, সত্যানন্দ এবং ওম প্রকাশ। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের টোবাটেক সিং জেলার কমলিয়া কসবা এলাকায় এই চার ভাই বসবাস করতেন। ১৯৫৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর তারা চলে এলেন বর্তমান ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে। সেখানে এসে তারা শুরু করলেন সাইকেলের যন্ত্রাংশের ব্যবসা। হঠাৎ করেই একদিন ব্রিজমোহন তার ভাইদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় সাইকেল তৈরি করার একটি কোম্পানি শুরু করার প্রস্তাব রাখলেন এবং পরক্ষণেই সামান্য আলোচনার পরেই চার ভাই ওই কোম্পানি তৈরীর জন্য রাজি হয়ে গেলেন।

পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলায় শুরু করা হলো সাইকেল তৈরির ব্যবসার কাজ। তবে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ততটা সহজভাবে কিন্তু এই ব্যবসা শুরু হয়নি। কাহিনীটা ছিল কিছুটা এরকম, অমৃতসরে যখন মুঞ্জাল ভাইয়েরা নিজেদের জিনিসপত্র বেঁধে লুধিয়ানা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক সেই সময় তাদের ছোট ভাই ওমপ্রকাশের বন্ধু করিম দীন তার সাথে শেষবারের মতো দেখা করতে আসেন। করিমের নিজের একটি সাইকেলের ব্যবসা ছিল এবং তিনি নিজের ব্র্যান্ডের নাম নিজে তৈরি করেছিলেন। করিম পাকিস্তান যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় ওম প্রকাশ তাকে কথায় কথায় তার ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করার অনুমতি চাইলেন। করিম তাকে তার ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করার অনুমতিও দিলেন। সেখান থেকেই শুরু হলো ‘হিরো’ মোটরসাইকেলের যাত্রা।

Advertisement

কোম্পানির নাম তো তৈরী হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু, দেশভাগের পর লুধিয়ানা এসে নতুন ব্যবসা শুরু করে তাদের জন্য খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। সবথেকে বড় কথা, তাদের ব্যবসা সেই সময় খুব সাধারণ কোনো ব্যবসা ছিল না, তাই কোনো বড় কোম্পানি তাদেরকে লোন দিতে প্রস্তুত হয়নি। অগত্যা লুধিয়ানার গলি এবং ফুটপাথে বসে সাইকেলের যন্ত্রাংশ বিক্রি করার ব্যবসা শুরু করেন ওই চার ভাই। ওই টাকায় তাদের দিন গুজরান হয়ে যেত। সময়টা বদলালো মোটামুটি ছয়-সাত বছর পর। ১৯৫৬ সালে প্রথমবার কোন ব্যাংক তাদেরকে তাদের ব্যবসা শুরু করার জন্য লোন দিতে প্রস্তুত হলো। ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে লুধিয়ানায় তারা গড়ে তুললেন তাদের সাইকেলের যন্ত্রাংশ তৈরি প্রথম ইউনিট। বাস্তবিকভাবে হিরো সাইকেলের উত্থান শুরু হয় ঠিক এই জায়গা থেকে।

আগামী দশ বছরের মধ্যে এই কোম্পানি দুর্দান্ত উন্নতির মুখ দেখে। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এই কোম্পানি প্রায় ১ লক্ষ সাইকেল ইউনিট তৈরি করে ফেলে, যা হিরো কোম্পানিকে উন্নতির একেবারে শিখরে পৌঁছে দেয়। এই চারজন ভাইয়ের পরিশ্রমের ফল প্রতিদিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৮৬ সালে গিনিস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও এই হিরো সাইকেল কোম্পানির নাম উঠে আসে। বিশ্বের সবথেকে বড় সাইকেল নির্মাতা কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় হিরো। মুঞ্জাল ভাইয়েরা নিজেদের ডিলার, ওয়ার্কার এবং গ্রাহকদের সাথে নিয়েই সব সময় চলেছিলেন, তাই হিরো কোম্পানি তেমনভাবে কোনদিন ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। অন্য কোম্পানিগুলিকেও পিছনে ফেলে দিয়েছিল এই হিরো সাইকেল কোম্পানিটি।

দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতের সাইকেলের বাজারে নিজের আধিপত্য তৈরি করার পর ১৯৮৪ সালে মোটরসাইকেলের মার্কেটেও আসতে শুরু করে হিরো। এতদিন পর্যন্ত হিরো কোম্পানির পোর্টফলিওতে ছিল শুধুমাত্র সাইকেল সাইকেলের যন্ত্রাংশ ও অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ। তবে এবারে তার সাথে যুক্ত হলো মোটরসাইকেল, যা ভারতীয় বাইক এবং মোটরসাইকেলের জগতে বর্তমানে একটি মাইলফলকের রূপ ধারণ করেছে। কোম্পানির নাম রাখা হলো ‘হিরো মোটরস’। প্রথম বাইক হিরো ম্যাজেস্টিকের মাধ্যমেই ভারতীয় বাইকের একেবারে সংজ্ঞা বদলে দিল এই সংস্থা।

মাস কয়েকের মধ্যেই এই কোম্পানি সাড়া ফেলে দিল ভারতীয় মার্কেটে। বাইকের প্রযুক্তি আরও উন্নত করার জন্য জাপানের দিগ্গজ মোটরসাইকেল কোম্পানি হোন্ডার সাথে যুক্ত হয়ে মুঞ্জাল ভাইয়েরা তৈরি করলেন হিরো হোন্ডা মোটরস লিমিটেড। ১৯৮৫ সালের ১৩ এপ্রিলে এই কোম্পানি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন এই চার ভাই। ১৯৮৫ সালেই হিরো হোন্ডা কোম্পানির ট্যাগ নিয়ে মার্কেটে এলো তাদের প্রথম বাইক সিডি ১০০, যা তাদেরকে ভারতের বাইকের মার্কেটে এনে দিল অভূতপূর্ব সাফল্য। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে হিরো এবং হোণ্ডা একসাথে পথ চলেছে। একের পর এক দুর্দান্ত ডিজাইনের সহজলভ্য এবং সস্তা অথচ টেকসই বাইক দিয়ে ভারতীয় জনতার মন জিতে নিয়েছে হিরো এবং হোন্ডা। ২০১১ সালে দুটি কোম্পানির সম্পর্ক ছিন্ন হলেও, এখনো তারা একে অপরকে সমীহ করেন। যাত্রা শুরু হয় হিরো মোটোকর্পের। সেই কোম্পানির বয়সও এখন প্রায় ১১ বছর। বর্তমানে হিরো এবং হোন্ডা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, তবুও তারা কখনো প্রতিযোগিতার খেলায় নিজেদের মান খোয়ায়নি। হিরো যেখানে মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের জন্য বাইক তৈরি করে, সেখানেই হোন্ডা তৈরি করে স্পোর্টস-লাভার জনতার জন্য বাইক। হিরো মোটোকর্পের এই সাফল্যের কাহিনী সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ী।

Related Articles

Back to top button